ঝালকাঠি জেলা বিএনপির সদস্য রফিকুল ইসলাম জামালকে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির ‘ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক’ পদে মনোনীত করা হয়েছে।
২০১৮ সালে ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক বদরুজ্জামান খান খসরুর মৃত্যুর পর থেকে এই পদটি শূন্য ছিল। দীর্ঘদিন পর এই পদে নতুন কোনও দায়িত্বশীল দিলো বিএনপি।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি ও ঝালকাঠির স্থানীয় একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, মূলত বিএনপি ত্যাগী শাহজাহান ওমরের বিকল্প নেতা তৈরি করার জন্য রফিকুল ইসলাম জামালকে সামনে এনেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঁঠালিয়া) আসনে দলের প্রতিনিধিত্বশীল নেতৃত্ব সৃষ্টির জন্য রফিকুল ইসলাম জামালকে বেছে নিয়েছেন তিনি।
বুধবার (২১ ফেব্রুয়ারি) দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদের স্বাক্ষর করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘ঝালকাঠি জেলা বিএনপির সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম জামালকে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক পদে মনোনীত করা হয়েছে। দল আশা প্রকাশ করে, মো. রফিকুল ইসলাম জামাল দলকে সুসংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।’
নতুন পদ পাওয়ায় দলের নেতৃত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন রফিকুল ইসলাম জামাল। এবি বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমি নতুন দায়িত্ব পেয়ে দলের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমি মনে করি, ঝালকাঠি জেলা বিএনপিকে সুসংগঠিত করতে—মানুষ যেভাবে সাড়া দিয়েছে, বিগত দিনের আন্দোলন-সংগ্রাম ও দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে দলের নেতাকর্মীরা যেভাবে ত্যাগ স্বীকার করেছে, তারই উপহার এই দায়িত্ব।’
দলের নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিচার-বিশ্লেষণ সাপেক্ষে প্রতিশ্রুতিশীল ও নতুনদের সুযোগ সৃষ্টির চিন্তা শুরু হয়েছে বিএনপিতে। সহসাই কাউন্সিল করার কোনও সুযোগ নেই বলে শূন্য পদে নিয়োগ দেবেন তারেক রহমান।
২০১৬ সালের ১৯ মার্চ দলের ষষ্ঠ কাউন্সিলের পর দুই দফায় ৬০০ জনের বেশি সদস্য নিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করে বিএনপি। সেই সদস্য সংখ্যা কমে এখন ৫০২ জনে দাঁড়িয়েছে। বাকি ৯৮ জনের মধ্যে বেশিরভাগই মারা গেছেন। আবার কেউ কেউ বহিষ্কৃত হয়েছেন, কেউ দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। বর্তমানে অন্তত অর্ধশতাধিক পদ শূন্য রয়েছে বলে বিএনপির দাফতরিক একটি সূত্রে জানা গেছে।
২০১৬ সালের কাউন্সিলের পর ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক পদে আসেন বদরুজ্জামান খান খসরু। ২০১৮ সালের ১১ জুলাই তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার মৃত্যুর পর এই পদটি এতদিন শূন্য ছিল।
বুধবার ওলামা দলের সাবেক আহ্বায়ক মাওলানা শাহ নেছারুল হক এবি বার্তাকে জানান, ধর্ম সম্পাদক পদে রফিকুল ইসলাম জামালের আগে এ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন আমির উদ্দিন, মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন, মাসুদ আহমেদ তালুকদার ও বদরুজ্জামান খান খসরু।
দলের গঠনতন্ত্র উদ্ধৃত করে বিএনপির মিডিয়া সেল সদস্য শায়রুল কবির খান এবি বার্তাকে বলেন, ‘বিএনপিতে ধর্ম সম্পাদক ও আরও চার জন সহ-সম্পাদক পদের কাজ হচ্ছে, বাংলাদেশে যে স্ব-স্ব ধর্মীয় আচার-রীতিনীতি আছে, তার প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করা।’
বিএনপির চার জন সহ-ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক হলেন—এ টি এম আব্দুল বারী ড্যানি, অমলেন্দু অপু, জন গমেজ ও দীপেন দেওয়ান।
গঠনতন্ত্রে ধর্ম সম্পাদকের বিশেষ দায়িত্ব থাকলেও মূলত ঝালকাঠি জেলা বিএনপিকে পুনর্গঠন, সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমরের নির্বাচনি আয়োজন ও ভোট থেকে নেতাকর্মীদের ফিরিয়ে রাখতে সাংগঠনিক দক্ষতার পুরস্কার হিসেবে কেন্দ্রীয় কমিটিতে রফিকুল ইসলাম জামালকে জায়গা দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে প্রভাব তৈরিতে ‘বিশেষ কোনও বাধা’ যেন সমস্যা সৃষ্টি করতে না পারে, সেদিকে নজর রেখেই কেন্দ্রীয় পদে তার এই নিযুক্তি।
এ প্রসঙ্গে মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খানের ভাষ্য, ‘সার্বিক বিবেচনায় অনৈতিক আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নেতা দরকার। আমি যতটুকু জানি, তিনি (রফিকুল ইসলাম জামাল) যেমন দলের নেতৃত্বের প্রতি অনুগত আছেন, তেমনই দলের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
ঝালকাঠি জেলার একাধিক নেতার ভাষ্য—শাহজাহান ওমরের বিকল্প হিসেবে রফিকুল ইসলাম জামালকে কেন্দ্রে পদ দেওয়া হয়েছে। পেশাগতভাবে তিনি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাকে কেন্দ্রে দায়িত্ব দেওয়া প্রসঙ্গে ঝালকাঠি জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মো. শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘শাহজাহান ওমর দলের সঙ্গে বেইমানি করে চলে যাওয়ায় তার বিকল্প হিসেবে রফিকুল ইসলাম জামালকে জাতীয় নির্বাহী কমিটির সম্পাদকীয় পদে মূল্যায়ন করায় ঝালকাঠি জেলা বিএনপি পরিবার অত্যন্ত আনন্দিত।’
তার দাবি, শাহজাহান ওমর দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিলেন না। দলের ভাইস চেয়ারম্যান থাকায় বাধ্য হয়ে কিছু নেতাকর্মী তার আদেশ-নির্দেশ পালন করলেও চাপা ক্ষোভ বিরাজমান ছিল। কিন্তু রফিকুল ইসলাম জামাল কর্মিবান্ধব হওয়ায় সবার আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন।’
‘রফিকুল ইসলামকে ধর্ম সম্পাদক হিসেবে মূল্যায়ন করায় দল আরও বেশি সুসংগঠিত হবে এবং রাজাপুর-কাঠালিয়াসহ পুরো জেলায় একটি মজবুত সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি হবে’ বলে উল্লেখ করেন শাহাদাৎ হোসেন।
এ প্রসঙ্গে রফিকুল ইসলাম জামালের ভাষ্য, ‘কারও জায়গা কখনও পূরণ হয় না। কখনও তার চেয়ে ভালো হতে পারে, আবার কখনও খারাপও হতে পারে। ওনার (শাহজাহান ওমর) জায়গায় উনি আছেন।’
‘৪৫ বছর রাজনীতি করেও ভোটকেন্দ্রে ভোটার নিতে পারেননি শাহজাহান ওমর’, এমন মন্তব্য করেন জামাল। তার ব্যাখ্যা, ‘উনি কখনও গালি দেন, কখনও থাপ্পড় মারেন। ওনার জায়গা পূরণ হওয়া তো কোনও প্রসঙ্গ না। উনি তো বিএনপির কোনও লোককেও কেন্দ্রে নিতে পারেননি। বিএনপি এখানে (ঝালকাঠিতে) অনেক সুসংগঠিত, ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হবে।’